রাতে চাঁদা চেয়েছিল ৮ লাখ, সকালেই দুই ভাই লা’শ

19

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজে’লার দুই সহোদর ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে কথিত ‘ব’ন্দুকযু’দ্ধের’ নামে হ’ ত্যা করেন টেকনাফ থা’নার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমা’র দাশ।

চন্দনাইশ থা’নার ভা’রপ্রাপ্ত ক’র্মক’র্তা কেশব চক্রবর্তীর যোগসাজশে ওই দুই ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে খু’ন করা হয়েছে বলে কথিত ‘ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত’ দুই ভাইয়ের স্বজনদের অ’ভিযোগ। গত ১৬ জুলাই টেকনাফ থা’না এলাকায় ‘ইয়াবা কারবারি হিসেবে ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত’ হওয়া দুই ভাইয়ের একজন ছিলেন প্রবাসী।

এদের নামে কোনো থা’নায় একটি মা’মলা কিংবা জিডিও ছিল না। যখন ধ’রে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনও কোনো অ’ভিযোগ ছিল না। করো’নাকালীন সংক’টে নিরূপায় হয়ে দেশে ফেরেন বাহরাইনপ্রবাসী ছোট ভাই আজাদ। দেশে ফেরার ২ মাস ১৪ দিনের মা’থায় গত ১৩ জুলাই এক ব’ন্ধুর ফোন পেয়ে চন্দনাইশের কাঞ্চননগর ইউনিয়নের নিজ ঘর থেকে,

বের হয়ে আর ঘরে ফেরেননি আজাদ। টানা দুই দিনেও আজাদের কোনো খোঁ’জ না পেয়ে থা’নায় সাধারণ ডায়েরি করার সিদ্ধা’ন্ত নেয় তার পরিবারের সদস্যরা। ছোট ভাই নি’খোঁ’জ হওয়ার ঠিক দুদিন পর ১৫ জুলাই বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজে’র সামনের ভাড়া বাসায় অ’ভিযান চালিয়ে আজাদের বড় ভাই ফারুককে আ’ট’ক করে নিয়ে যায় চন্দনাইশ থা’না পু’লিশ।

চন্দনাইশ থা’নার পরিদর্শক (ত’দন্ত) তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যদের জা’নায়, কোনো মা’মলা না থাকলেও স’ন্দে’হভাজন হিসেবে ফারুককে গ্রে’প্তার করা হয়েছে। পরিদর্শক (ত’দন্ত) এও নি’শ্চিত করেন, ওসি কেশব চক্রবর্তীর নির্দে’শেই ফারুককে গ্রে’প্তার করা হয়েছে।

ওসি বাইরে গেছেন, তিনি থা’নায় ফিরলে জিজ্ঞাসাবাদ করে ফারুককে ছে’ড়ে দেওয়া হবে বলে তিনি অবশ্য আশ্বস্ত করেন। পু’লিশের পরাম’র্শে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আবারও স্বজনরা চন্দনাইশ থা’নায় গেলে জা’নানো হয় টেকনাফ থা’নায় ১৪ জুলাই দা’য়ের করা একটি মা’মলায় ফারুককে টেকনাফ থা’নায় পা’ঠানো হয়েছে।

এদিকে থা’না থেকে ফেরার কয়েক ঘন্টার মা’থায় ফারুক ও আজাদের মায়ের মোবাইলে একটি নম্বর থেকে ফোন করে অ’জ্ঞাত পরিচয় একজন বলেন, ‘তোর দুই ছে’লে আমাদের কাছে আছে। দুই ছে’লেকে জীবিত ফেরত চাইলে রাতের মধ্যে আমাদের ৮ লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে সকালে ছে’লের লা’ শ পাবি।’ একথা বলেই সংযোগ বি’চ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

যেমন কথা তেমন কাজ। এর পরদিন ১৬ জুলাই সকাল ৮টা নাগাদ টেকনাফ থা’না থেকে তাদের মায়ের নম্বরে ফোন করে জা’নানো হয় দুই ভাই আজাদ ও ফারুক টেকনাফে ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত হয়েছে।

ওই সময় টেকনাফ থা’নার পক্ষ থেকে দেওয়া এক প্রেস বি’জ্ঞপ্তিতে দা’বি করা হয়, ‘চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এলাকা থেকে মা’দক সংগ্রহ ক’রতে এসে কক্সবাজারের টেকনাফে পু’লিশের স’ঙ্গে ব’ন্দুকযু’দ্ধে দুই ভাই নি’হত হয়েছেন।’

মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ হ’ ত্যামা’মলার আ’সামি টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপ কুমা’র দাশ ওই সময় জা’নিয়েছিলেন , টেকনাফের মৌলভীপাড়া এলাকায় ইয়াবা ক্রয় ক’রতে এলে গো’পন সংবাদের ভিত্তিতে আজাদুল হক নামে একজনকে আ’ট’ক করা হয়। পরে তার তথ্যের ভিত্তিতে মূল হোতা বড় ভাই ফারুককে আ’ট’ক করা হয়। এ সময় তারা স্বী’কার করে দীর্ঘদিন ধ’রে চট্টগ্রামে সরবরাহ ইয়াবা করে আসছিল। একপর্যায়ে দুই ভাইকে নিয়ে চকবাজার এলাকায় ইয়াবা উ’দ্ধার অ’ভিযানে গেলে সহযোগীরা পু’লিশের ওপর গু’লি ছোঁড়ে।

আজাদের বড় বোন আইরিন আক্তার বলেন, ‘আজাদ মাত্র কদিন আগে প্রবাস থেকে ফি’রেছিল। যেদিন সে নি’খোঁ’জ হয় সে সময় সে দুপুরের খাবার খেয়ে শুয়েছিল। হ’ঠাৎ একটা কল আসে তার মোবাইলে। তাকে বলতে শুনেছি, আচ্ছা আমি বের হচ্ছি দোস্ত। এভাবে নিশ্চয়ই কেউ ইয়াবা কিনতে চন্দনাইশ থেকে টেকনাফ চলে যাবে না?’

তিনি বলেন, ‘আ’সলে আজাদের কোনো ব’ন্ধুকে দিয়ে ফাঁদ পেতে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে একই কায়দায় নিয়ে যাওয়া হয় ফারুককে। আমা’র দুই ভাইয়ের বি’রুদ্ধে কোন মা’মলা বা ওয়ারেন্ট ছিল না। অথচ তাদেরই কিনা এভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে হ’ ত্যা করা হলো? আম’রা কার কাছে গিয়ে বিচার চাইবো? আমা’র বৃ’দ্ধা মা কিভাবে নিজেকে সান্তনা দেবেন? ফারুকের ১০ বছর বয়সী একটা মে’য়ে আর ১ বছরের একটা ছে’লে আছে। তাদের কী’ হবে?’

এদিকে শুরু থেকেই ফারুককে গ্রে’প্তার করা কিংবা টেকনাফ থা’নায় হস্তান্তরের কথা সাফ অস্বী’কার করে আসছিলেন চন্দনাইশ থা’নার ভা’রপ্রাপ্ত ক’র্মক’র্তা (ওসি) কেশব চক্রবর্তী।

তিনি বলছিলেন, এই বিষয়ে চন্দনাইশ থা’না পু’লিশ কিছুই জানে না। দুই সহোদরের মৃ’ত্যুর পর বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে এমন কথাই বলেছিলেন তিনি। তবে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের কাছে ফারুককে আ’ট’ক এবং এরপর টেকনাফ থা’নায় হস্তান্তরের কথা স্বী’কার করে নিয়েছেন কেশব চক্রবর্তী।

তিনি বলেন, ‘ফারুককে কোন মা’মলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রে’প্তার করা হয়েছে বলে তার পরিবার যে দা’বি করছে তা সঠিক নয়। কারণ অবশ্যই আছে।’ ঠিক কোন্ অ’ভিযোগে কোন্ প্রক্রিয়ায় ফারুককে গ্রে’প্তার ও টেকনাফ থা’নায় হস্তান্তর করা হয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে কেশব চক্রবর্তী বলেন, ‘সব তো আর ফোনে বলা যাবে না। আপনি থা’নায় আসুন। থা’নায় আ’সলে এই বিষয়ে বি’স্তারিত জানতে পারবেন।’

কেন দুই ভাই ওসি প্রদীপের রোষের শি’কার?

পরিবারের অ’ভিযোগের সূত্র ধ’রে ফারুক ও আজাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঠিক কী’ কারণে ওসি প্রদীপের এমন রোষানলের হলেন শি’কার দুই ভাই?

উত্তরে তাদের বড় বোন আইরিন আক্তার বলেন, ‘আমি জানি না কেন আমা’র ভাইদের সাথে এমন ঘটলো? তবে খালি এটি বলতে পারি এই স’ম্পর্কে পু’লিশ যা বলেছে তা সত্য নয়। আমা’র দুই ভাইকেই পু’লিশ তুলে নিয়ে গিয়ে হ’ ত্যা করেছে। কেন কী’ হয়েছে সে বিষয়ে ত’দন্ত করে সত্য ঘ’টনা প্র’কাশ করা হোক।’

পরিবারের কেউ এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি না হলেও অনুসন্ধানে জা’না গেছে, বছরদুয়েক আগেও ফারুকের বি’রুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অ’ভিযোগ ছিল। সে সময়ে বিষয়টি জা’নাজানি হলে ফারুকের মা এলাকাবাসীকে ডেকে রীতিমতো বিচার বসিয়েছিলেন নিজে’র ছে’লের বি’রুদ্ধেই। এই পথ থেকে সরে না আসা পর্যন্ত ফারুককে নিজে’র ছে’লে বলে পরিচয় দেবেন না বলেও সাফ জা’নিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সে সময় ফারুককে বাড়ি থেকে বেরও করে দেন তার বৃ’দ্ধা মা। পরে মা ও এলাকাবাসীর চা’পে মা’দক ব্যবসা ছে’ড়ে দেন ফারুক। তবে সবসময় একটা ভ’য়ে থাকতেন তিনি।

স্থা’নীয় একজন সমাজক’র্মী নাম প্র’কাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মায়ের কট্টর অব’স্থানের কারণে বছরখানেক আগ থেকে ইয়াবা ব্যবসা ছে’ড়ে দেয় ফারুক। কিন্তু তার একটা ভ’য় ছিল। যে এই লাইন ছে’ড়ে দিলে সে বি’পদে পড়তে পারে। এই কারণে সে আ’লাদা বাসায় থাকতো। আমাদের ধারণা তার ভ’য়টাই সত্যি হয়েছে। ব্যবসা ছে’ড়ে দেওয়ার মাশুল হিসেবেই তার ওপর ক্ষোভ ছিল এই চক্রের সদস্যদের। আর এই কারণে তার ছোট ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার কাছ থেকে ফারুকের ঠিকানা বের করে। পরে দুই ভাইকে এক সাথেই হ’ ত্যা করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘আজাদের লা’ শের শ’রীরে প্রচুর আ’ঘাতের চিহ্ন ছিল। মাত্র ২ মাস আগে বিদেশ থেকে আসা আজাদ কোনো কিছুতেই জ’ড়িত ছিল না। আমাদের অভ’য়ে ফারুক এই পথ ছে’ড়ে দিয়েছিল। এর মাশুল এভাবেই দিতে হলো— এটা ভেবে খা’রাপ লাগছে। এই ঘ’টনার ত’দন্ত করা উচিত। কারণ মা’দক ব্যবসা ছে’ড়ে দেয়ার জন্য যদি সত্যিই এমন মাশুল দেওয়া লাগে তাহলে কোনভাবেই দেশ মা’দকমু’ক্ত হবে না।’- চট্টগ্রাম প্রতিদিন।